রজব মাসের কিছু কথা ও কুসংস্কার

প্রকাশিত: ২:৩৬ অপরাহ্ণ, মার্চ ৪, ২০২১ 189 views
শেয়ার করুন
“আসমান-জমিন সৃষ্টির দিন থেকেই আল্লাহর বিধানে মাসগুলোর সংখ্যা হল বারো, তন্মধ্যে চারটি নিষিদ্ধ মাস। এটা হল সু-প্রতিষ্ঠিত ব্যবস্থা। কাজেই ঐ সময়ের মধ্যে নিজেদের উপর জুলুম করো না।” (সূরা তাওবা: আয়াত: ৩৬)
 
প্রিয় পাঠক! উল্লেখিত আয়াতে কারীমার একাংশে বলা হয়েছে “তার মধ্যে চারটি নিষিদ্ধ মাস”। আরবী বর্ষপঞ্জিকার কোন এই চারটি মাস? এর পরিচয় মহানবী সা. হাদিসের মাধ্যমে তুলে ধরেছেন এই পথহারা জাতির সামনে। হাদিসটি হলো হযরত আবু বাকরাহ রা. কর্তৃক নবী করীম সা. হতে বর্ণিত, তিনি বলেন: “আল্লাহ তাআলা যেদিন আসমান-যমীন সৃষ্টি করেছেন সেদিন যেভাবে যামানা ছিল তা আজও তেমনি আছে। বৎসর হচ্ছে বারো মাসে তার মধ্যে চারটি পবিত্র যার তিনটি মাস পরস্পর ধারাবাহিক (সেগুলো হলো) জিলকদ, জিলহজ এবং মুহাররাম আর মুদার গোত্রের রজব মাস যা জুমাদিউস সানী ও শাবান মাসের মধ্যবর্তী। (বুখারী শরীফ: ৪৬৬২, মুসলিম শরীফ: ১৬৭৯)
 
আমরা মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হাদিস মারফত চিনতে বা বুঝতে পারলাম যে জিলকদ, জিলহজ, মুহাররাম ও রজব মাস হচ্ছে সম্মানিত। আইয়ামে জাহেলিয়াতের যুগেও পুরো আরবে বছরের মধ্যে এই চার মাস পবিত্র বলে ঘোষণা করেছিল। তবে বাসল নামক তাদের একটি দল অতিরঞ্জিত করে ও বাড়াবাড়ি বশত বৎসরে আটটি মাসকে সম্মানিত মনে করত; এগুলোতে যুদ্ধ-বিগ্রহ নিষিদ্ধ বলে ঘোষণা দিয়েছিল।
 
এ মাসগুলোকে ‘হারাম’ আখ্যায়িত করা হয় দু’টি কারণে:
 
১. এ মাসগুলোতে যুদ্ধ-বিগ্রহ হারাম হওয়ার কারণে। তবে শত্রুপক্ষ যদি প্রথমে যুদ্ধের সূত্রপাত করে সেটা ভিন্ন ব্যাপার।
 
২. এ মাসগুলোতে হারাম (গুনাহের) কাজে লিপ্ত হওয়া অন্য মাসে নিষিদ্ধ কার্যক্রমে লিপ্ত হওয়ার চেয়ে বেশি গুনাহ। অন্যথায় স্বীয় নফসের উপর জুলুম করা বা অন্য কোন গুনাহে জড়িত হওয়া, সব মাসেই হারাম ও নিষিদ্ধ।
 
হারাম তথা সম্মানিত ও যুদ্ধ-বিগ্রহ নিষিদ্ধ মাসগুলোর অন্যতম হলো রজব। যা আরবি চন্দ্রবর্ষের সপ্তম মাস। রজব মাসের পূর্ণ নাম হলো ‘আর রজব আল মুরাজজাব’ বা ‘রজবুল মুরাজ্জাব’। রজব অর্থ সম্ভ্রান্ত, প্রাচুর্যময়, মহান। মুরাজ্জাব অর্থ সম্মানিত। ‘রজবে মুরাজ্জাব’ অর্থ হলো প্রাচুর্যময় সম্মানিত মাস।
 
উলামায়ে কেরাম বলেছেন, ‘আশহুরে হুরুম’ তথা এই চার মাসের এমন বৈশিষ্ট্য রয়েছে যে, এসব মাসে ইবাদতের প্রতি যত্নবান হলে বাকি মাসগুলোতে ইবাদতের তাওফীক হয়। আর আশহুরে হুরুমে কষ্ট করে গুনাহ থেকে বিরত থাকতে পারলে অন্যান্য মাসেও গুনাহ পরিহার করা সহজ হয়। (আহকামুল কুরআন, জাসসাস ৩/১১১; মাআরিফুল কুরআন ৪/৩৭২)
 
সম্মানিত পাঠক, আমরা দেখি এই মাসগুলোকে কেন্দ্র করে অনেক দ্বীনি ভাই এমন অনেক কার্যক্রমে লিপ্ত হন যার ব্যাপারে কুরআন-সু্‌ন্নাহর বিশুদ্ধ কোন প্রমাণ নেই। যেমন, রজব মাসকে কেন্দ্র করে বিশেষভাবে কিছু রোযা রাখা, ইবাদত-বন্দেগী করা, রজবী উমরা পালন করা, সালাতুর রাগায়েব, মেরাজ দিবস কিংবা ২৭ তারিখে শবে মেরাজ পালন করা ইত্যাদি।
 
রজব মাসকে কেন্দ্র করে আমাদের সমাজে বেশ প্রচলিত কতিপয় নতুন আবিষ্কৃত আমল বা কুসংস্কার নিম্নে তুলে ধরা হলো।
 
১. রজব মাসের ২৭ তারিখ রজনী সওয়াবের আশায় মসজিদে জমায়েত হওয়া ও মাহফিল করা:
 
রজব মাসের অন্যতম রাত্রি হল ২৭শে রজব যা লাইলাতুল মিরাজ বা শবে মেরাজ নামে প্রসিদ্ধ। মেরাজের রজনি নির্দিষ্ট করণের ব্যাপারে কোন বিশুদ্ধ হাদিস বর্ণিত হয়নি। যা বিদ্যমান আছে, সব জাল, ভিত্তিহীন। (বেদায়া নেহায়া ২:১০৭, মাজমুউল ফতওয়া ২৫:২৯৮)
 
অতএব এ রাতে অতিরিক্ত এবাদত ধার্য করা, যেমন রাত জাগা, দিনে রোজা রাখা, অথবা ঈর্ষা, আতশবাজি, উল্লাস প্রকাশ করা, মাহফিলের আয়োজন করা, ইত্যাদি নাজায়েজ।
উপরন্তু মেরাজ রাত্রি ঐতিহাসিকভাবেও সুনির্দিষ্ট নয়। প্রমাণিত মনে করলেও এতে মাহফিল করার কোন জো নেই। কারণ, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম, সাহাবায়ে কেরাম এবং আদর্শ পূর্বসুরীগণ হতে এ ব্যাপারে কোন দিক-নির্দেশনা পাওয়া যায়নি।
(ইন-শা-আল্লাহ! শবে মেরাজ ও এর ঘটনা নিয়ে বিস্তারিত প্রবন্ধ অচিরেই আসছে)
 
২. রজব মাসের রোজা:
 
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এবং তার সাহাবাদের থেকে রজব মাসের রোজার ফজিলতের ব্যাপারে প্রামাণ্য কোন দলিল নেই। তবে অন্যান্য মাসের মত এ মাসেও, সপ্তাহের সোমবার, বৃহস্পতিবার, মাসের তেরো, চৌদ্দ, পনেরো তারিখ, একদিন রোজা রাখা, পরের দিন না রাখা বৈধ ও সুন্নত।
 
ইবনে তাইমিয়া রহ. বলেন: “রজব মাসকে বিশেষ সম্মান দেখানো বিদআতের অন্তর্ভুক্ত যা বর্জন করা উচিৎ। রজব মাসকে বিশেষভাবে রোযার মওসুম হিসেবে গ্রহণ করাকে ইমাম আহমদ বিন হাম্বল সহ অন্যান্য ইমামদের নিকটে অপছন্দনীয়।” (ইকতিযাউস সিরাতিল মুস্তাকীম, ২য় খন্ড, ৬২৪ ও ৬২৫ পৃষ্ঠা)
 
ইবনে রজব বলেন: রজব মাসকে কেন্দ্র করে বিশেষভাবে রোযা রাখার ব্যাপারে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে কিংবা সাহাবীদের থেকে কোন কিছুই সহীহ ভাবে প্রমাণিত হয় নি।
 
হযরত ইসমাইল আল হারাবী, শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া, ইবনে হাজার আসকালানী প্রমুখ আলেমগণ এ মর্মে একমত যে, রজব মাসকে কেন্দ্র করে রোযা রাখার ব্যাপারে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে কোন সহীহ হাদীস প্রমাণিত হয় নি। এ মর্মে যা কিছু বর্ণিত হয়েছে সেগুলোর মধ্যে কিছু হল যঈফ আর অধিকাংশই বানোয়াট।
 
৩. রজব মাসে ওমরা:
 
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম রজব মাসে ওমরা করেছেন, এমন কোন প্রামাণ্য দলিল নাই। এ জন্য নির্দিষ্ট ভাবে রজবে ওমরা করা কিংবা এতে ওমরার বিশেষ ফজিলত আছে-বিশ্বাস করা বিদআত।
তবে, কেউ যদি স্বাভাবিক নিয়মে (ফজিলতের বিশ্বাস বিহীন) রজব মাসে ওমরা করে, তাতে দোষ নেই। কারণ, এ সময়েই তার জন্য ওমরা করার সুযোগ হয়েছে।
 
৪. রজব মাসের অন্যতম আবিস্কৃত আমল হল সালাতুর রাগায়েব:
 
এই নামাজ আদায় করার পদ্ধতি হলো:- রজব মাসের প্রথম শুক্রবার মাগরিব ও ইশার মধ্যবর্তী সময়ে বার রাকাত নামায পড়া। প্রতি রাকাতে সূরা ফাতিহা পড়বে একবার, সূরা কদর তিন বার, সূরা ইখলাস বারো বার। এবং সেজদা ও রুকুতে বিশেষ সংখ্যক দূরুদ পাঠ করা। প্রতি দু রাকাত পর সালাম ফিরানো। এভাবে বারো রাকাত নামায আদায় করা হয়।
 
ইমাম ইবনে তাইমিয়া রহ. বলেন: সালাতুর রাগায়েবের কোন ভিত্তি নাই বরং এটি একটি বিদআত। সুতরাং একাকী কিংবা জামাতের সাথে পড়াকে মুস্তাহাব বলা যাবে না। বরং সহীহ মুসলিমে বর্ণিত হয়েছে, আল্লাহর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বিশেষভাবে শুধু জুমার রাতে নফল নামায পড়তে আর দিনের বেলা রোযা রাখতে নিষেধ করেছেন। সালাতুর রাগায়েবের ব্যাপারে যে হাদীসটি উল্লেখ করা হয় তা আলেমগণের সর্ব সম্মত মতানুসারে বানোয়াট। কোন সালাফে সালেহীন অথবা ইমাম আদৌ এটি উল্লেখ করেন নি। (মাজমূউল ফতোয়া ২৩/১৩২)
 
হাদিস বিশারদগণের দৃষ্টিতে এ ব্যাপারে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কিংবা তাঁর অনুকরণীয় কোন ব্যক্তি থেকে বিশুদ্ধ সূত্রে এ ব্যাপারে কোন কিছুই পাওয়া যায় না। বরং তা পরবর্তী যুগে আবিষ্কার করা হয়েছে। সুতরাং এ নামাযগুলো নিকৃষ্ট বিদআত ও প্রত্যাখ্যান যোগ্য। একে পরিত্যাগ করা, এর থেকে বিরত থাকা এবং এর সম্পাদনকারীকে নিষেধ করা কর্তব্য।
 
৫. রজব মাসে গুরুত্বসহকারে কবর জিয়ারত করা এটিও বেদআত। কারণ, কবর জিয়ারত বছরের যে কোন সময় হতে পারে।
 
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নতুন আবিষ্কৃত বিষয় সমূহ থেকে দূরে থাকার ব্যাপারে বিশুদ্ধ সূত্রে হাদিস বর্ণিত রয়েছে।
তিনি বলেন: “তোমরা দ্বীনের মধ্যে নতুন আবিষ্কৃত বিষয় সমূহ থেকে দূরে থাক। কারণ, প্রতিটি নতুন আবিষ্কৃত বিষয় গোমরাহী। (সুনান ইবনে মাজাহ) সহীহ বুখারী ও মুসলিমে হযরত আয়েশা রা. হতে বর্ণিত। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন: “যে ব্যক্তি দ্বীনের অর্ন্তভুক্ত নয় এমন নতুন জিনিষ চালু করল তা পরিত্যাজ্য। (বুখারী, অধ্যায়: সন্ধি-চুক্তি।) “যে ব্যক্তি এমন আমল করল যার ব্যাপারে আমার নির্দেশ নাই তা প্রত্যাখ্যাত। (মুসলিম, অধ্যায়: বিচার-ফয়সালা)
অতএব প্রত্যেক মুসলমানের উচিৎ যে রজব মাস কে কেন্দ্র করে নবসৃষ্ট নামায, রোজা, মেরাজ দিবস ইত্যাদি থেকে দূরে থাকা এবং এ ব্যাপারে সাবধান হওয়া।
 
সেই সাথে এমন গর্হিত কর্মকাণ্ডকে ঘৃণা যোগ্য ও নিকৃষ্ট মনে করে কঠিন ভাবে মানুষকে এ থেকে নিষেধ করা। কারণ, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে সহীহ সূত্রে প্রমাণিত হয়েছে যে, তিনি বলেছেন: “তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি কোন অন্যায় কাজ দেখে সে যেন হাত দ্বারা পরিবর্তন করে দেয়, যদি তা না পারে তবে মুখের কথা দ্বারা পরিবর্তন করে আর তাও না পারলে তার প্রতি অন্তরে ঘৃণা পোষণ করে। (সহীহ মুসলিম, কিতাবুল ঈমান) সুতরাং সাধারণ মানুষের নিকট বাজারের অনির্ভরযোগ্য যে সমস্ত বই-পুস্তকে রজব মাস উপলক্ষে বিশেষ নামায ও রোযা ইত্যাদির কথা পাওয়া যায় তা সবই ভিত্তিহীন। এ ধরনের মনগড়া আমল দ্বারা এ মাসের ফযীলত লাভ করা সম্ভব নয়। এটার প্রচার-প্রচারণা এবং তাদের সংশয়গুলো দেখে কেউ যেন ধোকায় না পড়ে যায়। অবশ্য কোন ব্যক্তি যদি প্রতি মাসে কিছু নফল রোযা রাখে সে এমাসেও সেই ধারাবাহিকতা অনুযায়ী এ মাসে রোযা রাখতে পারে, শেষ রাতে উঠে যদি নফল নামাযের অভ্যাস থাকে তবে এ মাসের রাতগুলোতেও নামায পড়তে পারে।
 
প্রিয় পাঠক! পরিশেষে বলব- আমারদের তো অনুসরণ করতে হবে কেবল নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবং তার নির্দেশকে। যে ব্যাপারে তিনি নিষেধ বা সতর্ক করেছেন সেটা তে লিপ্ত হওয়া যাবে না। আর যেগুলো সম্পর্কে তিনি আদেশ করেছেন তা অধিক পরিমাণে পালন করার চেষ্ট করা। আল্লাহ তায়ালা আমাদেরকে সকল অবস্থায় তাওহীদ ও সুন্নাহর উপর আমল করার তাওফীক দান করুন এবং বিদয়াত ও ইসলাম বিরোধী কার্যক্রম থেকে হেফাজত করুন। আমীন।