জামালগঞ্জে হাওরের বাঁধে কোটি টাকার দুর্নীতির জাল

প্রকাশিত: ৮:৪৩ অপরাহ্ণ, ফেব্রুয়ারি ২১, ২০২১ 34 views
শেয়ার করুন
সুনামগঞ্জের জামালগঞ্জে ফসলরক্ষা বাঁধের নামে কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার জাল পাতা হয়েছে হাওরে। ছোট-বড় ৬টি হাওরের ৪৪টি পিআইসির মধ্যে বেশ কয়েকটি পিআইসি আছে যেগুলোতে দ্বিগুণেরও বেশি বরাদ্দ দিয়ে সরকারি কোটি টাকা লোপাটের সুযোগ সৃষ্টি করা হয়েছে। অনেকগুলো বাঁধে ক্লোজার নেই, তবু মোটা অংকের বরাদ্দসহ কোনো কোনো ক্লোজারে প্রায় ৬০ ভাগ মাটি অক্ষত থাকা সত্ত্বেও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ক্লোজারের নামে অধিক বরাদ্দ দিয়ে নিজেদের স্বার্থ সংরক্ষণের প্রচেষ্টা চালিয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
 
এসকেভেটর দিয়ে পুরোনো মাটি এদিক-সেদিক করে নতুন মাটি ফেলার বাহানা দেখিয়ে গণমাধ্যমকর্মীদের দৃষ্টি এড়ানোরও চেষ্টা করা হচ্ছে বাঁধে। এছাড়া বরাদ্দের অঢেল অর্থ হজম করতে ক্লোজার ভরাট না করে রোপণকৃত জমির উপর দিয়েই বাঁধ নির্মাণ করা হচ্ছে। সরেজমিন পরিদর্শনসহ হাওর সচেতন মানুষের সঙ্গে কথা বলে এমনটা নিশ্চিত হওয়া গেছে।
 
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, শনি হাওরের লালুর গোয়ালা ক্লোজারে (২০ নম্বর পিআইসি) অর্ধেকেরও বেশি মাটি অক্ষত থাকলেও সেখানে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে প্রায় ২৪ লাখ টাকা। যদিও সেটি বিপজ্জনক ক্লোজার হিসেবে পরিচিত, তবে এবারের চিত্র সম্পূর্ণ ব্যতিক্রম। একই হাওরের (১৯ নম্বর পিআইসি) নান্টুখালি ক্লোজারে বড় ভাঙা থাকা সত্ত্বেও বরাদ্দ এসেছে তার অর্ধেক। এছাড়া পার্শ্ববর্তী হাওরের মামুদপুরের বিশাল ক্লোজার ভরাটসহ বাঁধ মেরামতে যেখানে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে প্রায় সাড়ে ২১ লাখ টাকা, সেখানে অর্ধেক অক্ষত লালুর গোয়ালায় বরাদ্দ এসেছে তার চেয়ে বেশি। এছাড়া এক বাড়িতে তিন পিআইসির একটি অর্থাৎ ৩৭ নম্বর পিআইসির অনুকূলে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল তিন গুণেরও বেশি। ০.৬৮০ কিলোমিটার এই বাঁধে ৬০৮২.৩৭ ঘনমিটার মাটি দেখিয়ে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল ১৬ লাখ ২৭ হাজার টাকা। পরবর্তীতে সিলেট মিররসহ স্থানীয় দৈনিকে অধিক বরাদ্দ সংক্রান্ত প্রতিবেদন প্রকাশ হলে তড়িঘড়ি তা কমিয়ে ৪ লাখ ৯০ হাজার টাকায় নিয়ে আসা হয়। এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত (শুক্রবার) ওই বাঁধে কোনো কাজ শুরু হয়নি।
 
এ ব্যাপারে ৩৭ নম্বর পিআইসির বরাদ্দ কত তা জানতে চাইলে সভাপতি মোজাম্মেল হোসেন বলেন, ‘দুর্গাপুর থাইক্যা মদনাকান্দি বাঁন্ধে বরাদ্দ ৪ লাখ ৯০ হাজার টাকা। এর আগে ১৬ লাখ আছিল, অখন কমাইয়া দিছে।’ কিন্তু কেন কমানো হয়েছে সে ব্যাপারে কিছু বলতে পারেননি তিনি।
 
অন্যদিকে ফেনারবাঁক ইউনিয়নের মিনি পাগনার ১৮, ১৯ ও ২০ নম্বর পিআইসিতে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে প্রায় ৫৬ লাখ টাকা। এর আগে এ নিয়ে বিস্তর প্রতিবেদনও প্রকাশিত হয়েছে। ২০১৯-২০২০ অর্থবছরে ওই ৩টি বাঁধে বরাদ্দ ছিল প্রায় সাড়ে ২৬ লাখ টাকা। গেল বছরে ওই বাঁধগুলোতে ছোটখাটো ভাঙা থাকলেও এ বছর কোনো ভাঙা নেই। তায়েবনগর থেকে শুরু হয়ে মিনি পাগনা ঘুরে যশমন্তপুর এসে যুক্ত হওয়া তিন বাঁধের প্রায় ৬০ ভাগ মাটি অক্ষত আছে। বাঁধের অনেকাংশে অল্পস্বল্প মাটি ফেললেই পুরোদস্তুর বাঁধ হয়ে যাবে। তারপরও মিনি পাগনায় বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে দুই থেকে তিন গুণ বেশি। এমন অনেক পিআইসি আছে যেগুলোতে পাউবো সংশ্লিষ্টরা মনগড়া প্রাক্কলণ করে পছন্দসই লোকদের সুবিধা পাইয়ে দেওয়াসহ পকেট ভারীর সুযোগ তৈরি করেছে বলে কথা উঠেছে।
 
অপরদিকে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, পাগনা হাওরের ১৪ নম্বর পিআইসির পাতিলাচূড়া বিলের বাঁধে প্রায় ৩ গুণ বেশি বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এই বাঁধের বিল সংলগ্ন একটি বড় ভাঙা রয়েছে। সেই ভাঙা দেখিয়ে সেখানে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে ২৩ লাখ ৭০ হাজার টাকা। কিন্তু ভাঙা বাদ দিয়ে দক্ষিণ পাশের হেমেন্দ্র চক্রবর্ত্তীর রোপণকৃত জমি নষ্ট করে তার ওপর দিয়ে বাঁধ বাঁধা হয়েছে। যে বাঁধ হচ্ছে সেখানে বড়জোড় ৭ থেকে ৮ লাখ টাকা হলেই যথেষ্ট বলে জানিয়েছেন হাওর বাঁচাও আন্দোলনের নেতারা।
 
উপজেলা হাওর বাঁচাও আন্দোলনের সিনিয়র সহ-সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা শফিকুল ইসলাম কলমদর বলেন, ‘আমরা বিভিন্ন বাঁধ ঘুরে দেখেছি বিগত বছরের অনেক বাঁধই এবার অক্ষত আছে। যেখানে সামান্য বরাদ্দ হলেই রিপিয়ারিং হয়ে যাবে, সেখানে ডাবল বাজেট দেওয়া হয়েছে। সেই অতিরিক্ত টাকাগুলো কে নেবে?’
 
পাগনার পারের বাঁধ থেকে ফিরে উপজেলা হাওর বাঁচাও আন্দোলনের সাধারণ সম্পাদক অঞ্জন পুরকায়স্থ জানিয়েছেন, গত বছর ১৪ নম্বর পিআইসিতে যে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল সেই একই পরিমাণ জায়গার একটি অংশে গর্ত হলেও সেই গর্ত দেখিয়ে অর্থ বৃদ্ধি করা হয়েছে ঠিক, কিন্তু টাকা বাঁচাতে গিয়ে গর্ত ভরাট না করে অন্যের রোপণকৃত জমি নষ্ট করে বাঁধ দেওয়া হচ্ছে। যেখানে কোনোভাবেই এত টাকার প্রয়োজন হবে না।
 
ক্ষতিগ্রস্ত জমির ক্ষতিপূরণ দাবি করে দিরাইয়ের রফিনগর ইউনিয়নের পাগনা পাড়স্থ স্বজনপুর গ্রামের হেমেন্দ্র চক্রবর্ত্তীর ছেলে বাসুদেব চক্রবর্ত্তী জানিয়েছেন, বর্তমানে তাদের জমির ওপর দিয়ে যে বাঁধ যাচ্ছে তাতে কম করে হলেও ২০ শতাংশ জমি নষ্ট হবে। এর আগে এই বাঁধ তাদের ৭৮ শতাংশ জমি নিয়ে গেছে। হিসেব করলে ১ একর জমি বাঁধের নীচে চলে গেছে। এখন পুরাতন যে বাঁধ আছে সেদিক দিয়ে যদি বাঁধ না যায় তাহলে নতুন করে আবারও জমি নষ্ট হবে। এভাবে একটু একটু করে যেতে যেতে সবকিছুই চলে যাচ্ছে বলে জানিয়েছেন তিনি।
 
এ নিয়ে সংশ্লিষ্ট (১৪ নম্বর) পিআইসির সভাপতি মো. বকুল মিয়া বলেন, ‘মেজারমেন্ট অনুযায়ী আমারে যে মাপজোখ দেওয়া হইছে আমি এই অনুযায়ী কাজ করতাছি। ক্লোজার যেখানো আছিল এইখান যদি আমি মাটি কাটি তা হইলে ক্লোজারে যে খোড় হইছে এই খোড়ের মাঝে বাঁধ টিকত না। তাই জমিন দিয়াই বাঁধ দেওয়া হইতাছে।’
 
উপজেলা কৃষক লীগের সাবেক আহ্বায়ক মো. আলী আমজাদ জানিয়েছেন, কৃষকের কাঁধে ভর করে ফায়দা লোটার সুযোগ খুঁজছে একটি মহল। উদ্দেশ্যমূলকভাবে দুর্বল মেজারমেন্ট করে সরকারি অর্থ পকেটস্থ করাই তাদের মূল লক্ষ্য। এতে বাঁধ যতটা না শক্তিশালী হবে তার চেয়ে বেশি লাভবান হবে ওই গোষ্ঠী। আর এটা করা হচ্ছে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সমন্বয়ে। না হলে বাঁধে অধিক বরাদ্দ আসে কী করে?
 
উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এম নবী হোসেন বলেন, ‘বাঁধের কাজে অনিয়মসহ বরাদ্দ বেশি- এমন অনেক অভিযোগ আমাদের কাছেও আসছে। হাওর ও কৃষকের স্বার্থে সরকার পর্যাপ্ত বরাদ্দও দিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু অর্থলোভী কিছু অসাধু কর্মকর্তার জন্য সরকারের দুর্নাম হচ্ছে। সময় চলে গেলেও অনেক প্রকল্পের কাজ শুরু হচ্ছে না- এমন অভিযোগও রয়েছে। এছাড়া বাঁধে কোনো নিয়ম-নীতিও মানা হচ্ছে না।’
 
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে সুনামগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী সবিবুর রহমান সিলেট মিররকে বলেন, ‘হাওরের বাঁধের কাজের মেজারমেন্ট নিয়ে প্রশ্ন তোলার কোনো সুযোগ নেই। পুরো সুনামগঞ্জে আমরা ১৫ জন সার্ভেয়ার মেজারমেন্টের কাজ করেছেন এবং তারা সুনামগঞ্জের বাইরের সার্ভেয়ার। কাজেই এখানে দুর্নীতির ঘটনা ঘটার কথা নয়।’
 
সকল পিআইসি ঠিকমতো কাজ করছে কি না এমন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘শুধু একটি পিআইসি কাজ করতে পারবে না বলে আমাদের কাছে সারেন্ডার করেছে। বাকিরা কাজ করছে। আমি এবং জামালগঞ্জের ইউএনও সাহেব সম্প্রতি বাঁধের কাজ দেখে এসেছি। আমাদের নজরদারি নিয়মিত আছে। আগামী ২৮ ফেব্রুয়ারি নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই আমরা সকল বাঁধের কাজ শেষ করব।’
_________________
সূত্রঃ সিলেট মিরর